০৫:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দুদক কি পরোক্ষ অস্ত্র? পদোন্নতির মুখে পুলিশের ১৫ ও ১৭ ব্যাচকে ঠেকাতে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পুলিশ প্রশাসনে আসন্ন পদোন্নতির সময় ঘনিয়ে আসতেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি গভীর চক্রান্তের অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দুর্নীতি দমন কমিশনকে সামনে রেখে সৎ ও দীর্ঘদিন বঞ্চিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। লক্ষ্য একটাই, গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি প্রক্রিয়া থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়া।
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক ড. মো. আশরাফুর রহমান এবং ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার সাবেক ওসি মো. শফিকুর রহমান খানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথাকথিত অনুসন্ধানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। তবে দুদক সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, কমিশনের কোনো সভায় এ ধরনের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়নি।
বেনামী অভিযোগ, পরিকল্পিত প্রচার
দুদক সূত্র জানায়, কমিশনে প্রতিদিন অসংখ্য বেনামী অভিযোগ জমা পড়ে। প্রাথমিক যাচাই ছাড়া সেগুলো সাধারণত আমলে নেওয়া হয় না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, উদ্দেশ্য যদি অনুসন্ধান না-ও হয়, তবুও প্রচারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামাজিক ও পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করাই এখানে মূল লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে।
টার্গেটে ১৫ ও ১৭ ব্যাচ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই অপচেষ্টার প্রধান লক্ষ্য বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৫তম ও ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা। বিগত সরকারের সময়ে যারা বৈষম্যের শিকার ছিলেন এবং এখন পদোন্নতির তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন। অভিযোগের তীর পুলিশ সদর দপ্তরের এক প্রভাবশালী অতিরিক্ত আইজিপির দিকেও ইঙ্গিত করছে, যিনি নিজের অবস্থান শক্ত করতে ভেতরে ভেতরে কৌশল নিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
সূত্রের মতে, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার ড. মো. নাজমুল করিম খানকে যেভাবে বিতর্কে জড়িয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, একই ছক এখন ডিআইজি ড. আশরাফুর রহমানের ক্ষেত্রে প্রয়োগের চেষ্টা চলছে। ড. নাজমুল করিম খান ২০২৩ সালে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলেও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর চাকরিতে ফিরে আসেন। তখনও একটি অংশের ধারাবাহিক প্রচারণা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিআইজি ড. আশরাফুর রহমান কে
ড. মো. আশরাফুর রহমান একজন পিএইচডিধারী পুলিশ কর্মকর্তা। পেশাগত সততা ও শৃঙ্খলার জন্য তিনি পরিচিত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ময়মনসিংহ রেঞ্জের দায়িত্ব নিয়ে তিনি ভেঙে পড়া চেইন অব কমান্ড পুনর্গঠনে কঠোর ভূমিকা নেন। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তাকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরাগভাজন করে তোলে।
গত কয়েক মাসে তার নেতৃত্বে ময়মনসিংহ রেঞ্জে প্রায় ৮০০ চিহ্নিত অপরাধী ও নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যায়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই সাফল্যই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগ তৈরির পেছনে মূল কারণ।
উদ্দেশ্য কী
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন পদোন্নতি বোর্ডকে সামনে রেখে এই অপপ্রচার শুরু হয়েছে। এর পেছনে তিনটি লক্ষ্য স্পষ্ট। প্রথমত, দুদকের নাম ব্যবহার করে মেধাবী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। দ্বিতীয়ত, জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে সৎ কর্মকর্তাদের মনোবল ভাঙা। তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের অনুগতদের বসিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা টিকিয়ে রাখা।
বিশ্লেষকদের সতর্কতা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যারা পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ চলতে থাকলে পুরো প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। এখনই যদি এসব তৎপরতা রোধ না করা যায়, তবে প্রশাসনে আবারও দলীয় প্রভাব ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
জনমনে তাই প্রশ্ন উঠছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে নিপীড়িত ছিলেন এবং বর্তমানে স্বৈরাচারবিরোধী অবস্থানে সক্রিয়, তাদের বিরুদ্ধেই কেন হঠাৎ করে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। সচেতন মহলের মতে, দুদক যেন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পরোক্ষ হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও সোচ্চার থাকতে হবে।

Tag :
About Author Information

শশীদল ইউনিয়নের নাগাইশ গ্রামের জাতীয়তাবাদীদল বিএনপি’র নেতা আটক;জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেয়

দুদক কি পরোক্ষ অস্ত্র? পদোন্নতির মুখে পুলিশের ১৫ ও ১৭ ব্যাচকে ঠেকাতে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

Update Time : ০৩:৪২:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পুলিশ প্রশাসনে আসন্ন পদোন্নতির সময় ঘনিয়ে আসতেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি গভীর চক্রান্তের অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দুর্নীতি দমন কমিশনকে সামনে রেখে সৎ ও দীর্ঘদিন বঞ্চিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। লক্ষ্য একটাই, গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি প্রক্রিয়া থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়া।
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক ড. মো. আশরাফুর রহমান এবং ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার সাবেক ওসি মো. শফিকুর রহমান খানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথাকথিত অনুসন্ধানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। তবে দুদক সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, কমিশনের কোনো সভায় এ ধরনের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়নি।
বেনামী অভিযোগ, পরিকল্পিত প্রচার
দুদক সূত্র জানায়, কমিশনে প্রতিদিন অসংখ্য বেনামী অভিযোগ জমা পড়ে। প্রাথমিক যাচাই ছাড়া সেগুলো সাধারণত আমলে নেওয়া হয় না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, উদ্দেশ্য যদি অনুসন্ধান না-ও হয়, তবুও প্রচারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামাজিক ও পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করাই এখানে মূল লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে।
টার্গেটে ১৫ ও ১৭ ব্যাচ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই অপচেষ্টার প্রধান লক্ষ্য বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৫তম ও ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা। বিগত সরকারের সময়ে যারা বৈষম্যের শিকার ছিলেন এবং এখন পদোন্নতির তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন। অভিযোগের তীর পুলিশ সদর দপ্তরের এক প্রভাবশালী অতিরিক্ত আইজিপির দিকেও ইঙ্গিত করছে, যিনি নিজের অবস্থান শক্ত করতে ভেতরে ভেতরে কৌশল নিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
সূত্রের মতে, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার ড. মো. নাজমুল করিম খানকে যেভাবে বিতর্কে জড়িয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, একই ছক এখন ডিআইজি ড. আশরাফুর রহমানের ক্ষেত্রে প্রয়োগের চেষ্টা চলছে। ড. নাজমুল করিম খান ২০২৩ সালে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলেও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর চাকরিতে ফিরে আসেন। তখনও একটি অংশের ধারাবাহিক প্রচারণা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিআইজি ড. আশরাফুর রহমান কে
ড. মো. আশরাফুর রহমান একজন পিএইচডিধারী পুলিশ কর্মকর্তা। পেশাগত সততা ও শৃঙ্খলার জন্য তিনি পরিচিত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ময়মনসিংহ রেঞ্জের দায়িত্ব নিয়ে তিনি ভেঙে পড়া চেইন অব কমান্ড পুনর্গঠনে কঠোর ভূমিকা নেন। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তাকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরাগভাজন করে তোলে।
গত কয়েক মাসে তার নেতৃত্বে ময়মনসিংহ রেঞ্জে প্রায় ৮০০ চিহ্নিত অপরাধী ও নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যায়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই সাফল্যই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগ তৈরির পেছনে মূল কারণ।
উদ্দেশ্য কী
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন পদোন্নতি বোর্ডকে সামনে রেখে এই অপপ্রচার শুরু হয়েছে। এর পেছনে তিনটি লক্ষ্য স্পষ্ট। প্রথমত, দুদকের নাম ব্যবহার করে মেধাবী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। দ্বিতীয়ত, জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে সৎ কর্মকর্তাদের মনোবল ভাঙা। তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের অনুগতদের বসিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা টিকিয়ে রাখা।
বিশ্লেষকদের সতর্কতা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যারা পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ চলতে থাকলে পুরো প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। এখনই যদি এসব তৎপরতা রোধ না করা যায়, তবে প্রশাসনে আবারও দলীয় প্রভাব ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
জনমনে তাই প্রশ্ন উঠছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে নিপীড়িত ছিলেন এবং বর্তমানে স্বৈরাচারবিরোধী অবস্থানে সক্রিয়, তাদের বিরুদ্ধেই কেন হঠাৎ করে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। সচেতন মহলের মতে, দুদক যেন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পরোক্ষ হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও সোচ্চার থাকতে হবে।