
মানবাধিকার দিবস : ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ও আজকের বাস্তবতা
-এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব।
প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। ১৯৪৮ সালের এ দিনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ The Universal Declaration of Human Rights (UDHR) গৃহীত করে, যা ৩০টি অনুচ্ছেদের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ সুরক্ষার ঘোষণা দেয়। আজ ৭৫ বছরেরও বেশি সময় পরও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান। ধর্মীয় দৃষ্টিতে মানবাধিকার কোনো নতুন ধারণা নয়; বরং প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলোতেই মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সাম্যের শক্ত ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মানবাধিকার-
*ইসলাম ও মানবাধিকার
ইসলাম মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছে।
মানুষের সম্মান:
আল-কুরআনে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।” (সূরা ইসরা ১৭:৭০)
ধর্মীয় স্বাধীনতা:
“ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা বাকারা ২:২৫৬)
জীবনের অধিকার:
“একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমতুল্য।” (সূরা মায়েদা ৫:৩২)
সমঅধিকার ও ন্যায়বিচার
“ন্যায়বিচার করো, যদিও তা তোমাদের নিজেদের কিংবা আত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়।” (সূরা নিসা ৪:১৩৫)
হজরত মুহাম্মদ ﷺ শেষ হজের ভাষণে মানবাধিকারের ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন, যেখানে তিনি জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা,
নারীর অধিকার,
শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি,
বর্ণভেদের উচ্ছেদ-
এসব মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। এটি আধুনিক UDHR-এর আগেই এক সর্বজনীন মানবাধিকার চার্টার হিসেবে বিবেচিত।
*খ্রিষ্টধর্ম:
বাইবেলে মানবতার প্রতি সম্মান ও প্রেমকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
“তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসো।” (Matthew 22:39)
মানবিক সহমর্মিতা, করুণা ও দুর্বলদের সুরক্ষা খ্রিষ্টধর্মের নৈতিক শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
*হিন্দু ধর্ম:
বেদের মন্ত্রে মানুষের মধ্যে ঐক্য, সাম্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার কথা বলা হয়েছে।
“সর্বজনের কল্যাণ হোক।” (সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু)
অহিংসা ও সততার পথ মানবিক অধিকারের মূল ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত।
*বৌদ্ধধর্ম:
বুদ্ধের দৃষ্টি ছিল মানবমুক্তি ও সমতার উপর।
প্রাণীর প্রতি অহিংসা ও করুণা,মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার,
দুঃখ দূরীকরণের পথ।
এসবই মানবাধিকারমূলক ভাবধারার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
মানবাধিকারের আধুনিক প্রেক্ষাপট ও পরিসংখ্যান
আন্তর্জাতিক সংস্থা Amnesty International এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩–২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৬০টিরও বেশি দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঘটনা ঘটেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ১১ কোটির বেশি মানুষ যুদ্ধ ও সংঘাতে বাস্তুচ্যুত।
UN Women এর তথ্য: বিশ্বে প্রতি ৩ জন নারীর মধ্যে ১ জন জীবদ্দশায় সহিংসতার শিকার হন।
UNICEF জানায়: প্রায় ১৫ কোটি শিশু শ্রমে নিযুক্ত—যা শিশু অধিকার লঙ্ঘনের বড় উদাহরণ।
এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে মানবাধিকার আজও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।
ধর্ম ও মানবাধিকার:
এক অভিন্ন লক্ষ্য
যে কোনো ধর্ম মানুষের সম্মান, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, করুণা ও সমঅধিকারের কথা বলে। ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে মানবতার দিকে আহ্বান করে, আর মানবাধিকার আইন সেই মানবতাকে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।
ধর্মীয় নৈতিকতা মানুষের আভ্যন্তরীণ বিবেককে জাগ্রত করে, আর মানবাধিকার আইন সেই বিবেককে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রদান করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭–৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
সমতা,বাকস্বাধীনতা,ধর্মীয় স্বাধীনতা,ন্যায়বিচার,শিক্ষা।
শিশুর অধিকার:
এসবকে সংবিধান সুরক্ষা দিয়েছে।
ধর্মীয় মূল্যবোধ, সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণার সমন্বয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার রক্ষায় ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছে—যদিও বাস্তব চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে।
উপসংহার:
মানবাধিকার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়,
মানুষের সম্মানই মানবতার মূল ভিত্তি।
ধর্মের শিক্ষা, আন্তর্জাতিক আইন, সংবিধান—সবখানেই মানুষের মর্যাদা রক্ষার কথা বলা হয়েছে।
আমরা যদি ধর্মীয় নৈতিকতা ও মানবাধিকারবোধকে সমাজে প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিময় ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
-এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব।
প্রতিষ্ঠাতা-মাওলানা আব্দুল হাকিম (রহ:)ফাউন্ডেশন।
খতিব ও টিভি প্রোগ্রাম উপস্থাপক।
এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব 














